মেহেরব হোসেন, কয়রা, খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনার কয়রার গা ঘেঁষে বয়ে গেছে সুন্দরবন। বনের মাছ, কাঁকড়া ও মধুই এখানকার ৭০% এর বেশি গরিব পরিবারের জীবিকা। বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে সবার মুখে একটু খাবার তুলে দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যায় হাজারো জেলে-বাওয়ালি।
জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে যারা প্রতিদিন বাঘ-কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে, সেই অসহায় জেলে-বাওয়ালিদের ঘাড়ে এখন নতুন বোঝা। প্রভাবশালীদের ছত্রছায় বনে সক্রিয় দস্যু বাহিনী আর তাদের কথিত সহযোগীদের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে কয়রার উপকূলীয় মানুষ। বাঘের ভয়ের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে দস্যুদের মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার।
প্রভাবশালীদের ইন্ধনে বনদস্যুরা দিনের পর দিন জেলে-বাওয়ালিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। চাহিদা পূরণ করতে না পারলে নেমে আসছে ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যার হুমকি।
এমনই অভিযোগ করেছেন কয়রা উপজেলার ৫ নং কয়রার জেলে মোঃ ইয়াদ আলী (৪৫), পিতা: মৃত্যু মোহর আলী। তার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন দক্ষিণ বেদকাশীর ছোট আংটিয়ারা এলাকার কাঁকড়া ব্যবসায়ী সোহেল মোল্লা (৪৩), পিতা: ইনতাজ মোল্লা।
ইয়াদ আলী জানান, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সোহেল মোল্লার কাছে কাঁকড়া বিক্রি করতেন। সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার আগে প্রতি ‘গণে’ অর্থাৎ ৭ থেকে ৮ দিনের জন্য দস্যু বাবদ ৭ হাজার টাকা এবং ফরেস্টার ও নৌ-পুলিশ বাবদ আরও ৭ হাজার — মোট ১৪ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে তার কাছে।
টাকা নেওয়ার পর সোহেল মোল্লা তার হাতে একটি ৫ টাকার নোট দিয়ে বলতেন, “এটা কাছে রাখবা। দস্যুরা ধরলে এই নোট দেখিয়ে আমার নাম বললে ছেড়ে দেবে।” কোনো গণে কাঁকড়া কম হলে ৮-১০ হাজার টাকা আয় হতো। তখনও পুরো ১৪ হাজার টাকা দিতে না পারলে বাকি টাকা খাতায় লিখে রাখা হতো। ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হতো।
একসময় ঋণের চাপে ইয়াদ আলী সোহেল মোল্লাকে জানান, তিনি আর এত টাকা দিতে পারবেন না এবং অন্য জায়গায় কাঁকড়া বিক্রি করে পাওনা শোধ করবেন। ইয়াদ আলীর অভিযোগ, এরপরই নেমে আসে হুমকি। সোহেল মোল্লা নাকি বলেন, “আমার কাছেই কাঁকড়া বিক্রি করতে হবে। অন্য জায়গায় বিক্রি করলে ডাকাত দিয়ে উঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করব।” মারপিট ও হত্যার হুমকিও দেন।
এরপর তিনি অন্য ব্যবসায়ীর কাছে কাঁকড়া বিক্রি শুরু করেন। কিছুদিন পর সুন্দরবনে গেলে তাকে অপহরণ করে ‘জুনাব বাহিনী’।
“জুনাব বাহিনীর প্রধান জুনাব আমার কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ১ মাস ১২ দিন আটকে রেখে পরিবারের মাধ্যমে আমি এখন যার কাছে কাঁকড়া বিক্রয় করি, আমার কোম্পানির থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাই,” বলেন ইয়াদ আলী।
অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত সোহেল মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ নাকচ করে দেন।
তার ভাষ্য, “আমি আজিজুল ও ইয়াদ আলীকে চিনি। তারা পূর্বে আমার কাছে কাঁকড়া বিক্রি করত। বর্তমানে আজিজুলের কাছে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ইয়াদ আলীর কাছে ৬৪-৬৫ হাজার টাকা আমার পাওনা আছে। পাওনা টাকা দিতে না পেরেই তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অভিযোগ তুলেছে। আমি কখনো দস্যুদের কার্ড বিক্রি করিনি। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তারা যা বলছে তার সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”
এ বিষয়ে কয়রা থানার (ওসি) রাশেদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, “বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”