মোঃ বিল্লাল হোসাইন সাব এডিটর
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কুতুবপুরে ‘গণউন্নয়ন’ সমবায় সমিতির শাখার বিরুদ্ধে শতাধিক নিম্নআয়ের মানুষের সঞ্চয় ও ঋণের অর্থ নিয়ে জটিলতা, মামলা বানিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত, লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না করা। কথিত হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি এবং প্রায় =৭০,০০০০/টাকা (সত্তর লক্ষ) টাকার নিয়ে হিসাবে গরমিল, এঅভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
সম্প্রতি উপজেলার কাঠালবাড়ী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় আয়োজিত মানববন্ধনে কাঠালবাড়ী ইউনিয়ন ও আশপাশের চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ সময় তারা ব্যানার হাতে নিজেদের পাওনা অর্থ ফেরত, লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব, মামলা সংক্রান্ত হয়রানি বন্ধ এবং অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, ভুক্তভোগী ইছাহাক খান (৭৫) পিতা:-মৃত্যু জামাল খান তিনি বলেন আমার কাছে থেকে বিভিন্ন সময়ে কুতুবপুর শাখার মাঠকর্মী শাহনাজ আক্তার =২৫,০০০০ লক্ষ (পঁচিশ লক্ষ) টাকা নিয়েছে মামলার ভয় দেখায়, পুলিশ দিয়ে ধরে নিয়ে যাবে আমি বয়স্ক মানুষ,জমি এবং বাড়ি বিক্রি করে টাকা দিয়েছি, এখন আমার কিছু নেই,বৌ, ছেলে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আপনাদের কাছে এবং সরকারের নিকট বিচার চাই। শহীদ ঢালি (৪০) পিতা:- মোঃ নুরুল ইসলাম ঢালি তিনি বলেন আমি:৫০,০০০ হাজার টাকা লোন নিয়ে ছিলাম টাকা পরিশোধ, তার পরেও আমার নামে মামলা দিয়েছে এবং টাকা চায়। মোঃ লিটন শেখ (৪০) পিতা: জলিল শেখ আমি:১০০০০০ এক লক্ষ টাকা লোন নিয়ে পরিশোধ করে দিয়েছি আমার নামে মামলা দিয়েছে, আরো অনেকে আছেন, আলতাফ খান,রানা হাওলাদার, মাহাবুব শিকদার,তোতা মৃধাসহ ভুক্তভোগী দিনমজুর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ। সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করা অর্থ এবং ঋণ নিয়ে ব্যবসা বা পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর পর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেও অনেকে আর্থিক ও আইনি জটিলতায় পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
সঞ্চয় ও ঋণের টাকা নিয়ে জটিলতার অভিযোগ
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘গণউন্নয়ন’ কুতুবপুর শাখার সঙ্গে সঞ্চয়, ঋণ ও কিস্তিভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের মাধ্যমে তারা নিয়মিত সঞ্চয় জমা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছেন।
তবে পরবর্তীতে সঞ্চয়ের টাকা ফেরত নেওয়া, ঋণের হিসাব সমন্বয় এবং কিস্তি পরিশোধের বিষয় নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। কয়েকজন ভুক্তভোগী দাবি করেন, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করার পরও তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের ব্যক্তিগত হিসাবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কে কত টাকা জমা দিয়েছেন, কত টাকা ঋণ নিয়েছেন, কত টাকা পরিশোধ করেছেন এবং বর্তমানে কার কত টাকা পাওনা এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান তারা।
ব্ল্যাংক চেক রেখে হয়রানির অভিযোগ ,মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী আরও অভিযোগ করেন, ঋণ নেওয়ার সময় তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক বা স্বাক্ষর করা চেক নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ওই চেক ব্যবহার করে মামলা বা আইনি জটিলতায় ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, ঋণের প্রকৃত হিসাব ও পরিশোধের তথ্য যাচাই না করে চেকের মাধ্যমে মামলা করা হলে নিম্নআয়ের মানুষগুলো আরও বড় আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ছেন।
তবে ব্ল্যাংক চেক গ্রহণ, চেকের ব্যবহার এবং এ সংক্রান্ত মামলাগুলোর প্রকৃত ঘটনা সংশ্লিষ্ট চেক, ঋণচুক্তি, রসিদ, ব্যাংক হিসাব ও আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
যেসব লেনদেনের তথ্য তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা
মানববন্ধনে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কয়েকজনের নাম, বয়স ও লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ইসাহাক খান (৭৫), পিতা জামান খান ,তার দাবি, তিনি ২৫ লাখ টাকা দিয়েছেন এবং অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতা রয়েছে।
শহিদ ঢালী (৪০), পিতা মো. নুরুল ইসলাম ঢালী তার দাবি, ৫০ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধ করলেও বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মো. লিটন শেখ (৪০), পিতা জলিল শেখ তার দাবি, তিনি ১ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন। এ ঘটনায় মামলা চলমান রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
আলতাফ খান (৫৫), পিতা সুলতান খান তার দাবি, তিনি ২ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন। তবে চেকসংক্রান্ত একটি মামলা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মো. রানা হাওলাদার (২৫) তার দাবি, ১ লাখ টাকার ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে ইদ্রিস হাওলাদারের সঙ্গে মামলা রয়েছে।
মাহাবুব শিকদার (৩৬), পিতা আলাল শিকদার তার দাবি, তিনি ২ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন। এ বিষয়েও মামলা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বাইরেও কাঠালবাড়ী ইউনিয়ন ও আশপাশের চরাঞ্চলের আরও বহু মানুষ একই ধরনের আর্থিক জটিলতার মধ্যে রয়েছেন।
তবে কার সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি হয়েছিল, কত টাকা গ্রহণ করা হয়েছে, কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং চলমান মামলাগুলোর প্রকৃত অবস্থা কী এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট রসিদ, হিসাবের খাতা, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের তথ্য এবং আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া
মানববন্ধনে ‘গণউন্নয়ন’-এর মাঠকর্মী শাহানাজের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে হিসাব-নিকাশের জটিলতার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তোলা হয়।
বক্তারা দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে শাহানাজের মাধ্যমে তারা সঞ্চয়ের টাকা জমা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই অর্থের হিসাব, ফেরত বা সমন্বয় নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
এ কারণে শাহানাজের দায়িত্ব, তার মাধ্যমে সম্পাদিত লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।
তবে শাহানাজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে ‘গণউন্নয়ন’-এর কর্মী মিনহাজের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়। তবে তাকে সরাসরি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক হিসাব ও নথিপত্র দেখতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন অভিযোগ করেন, ঋণের টাকা পরিশোধ করার পরও তারা মামলা ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ কেউ জেলও খেটেছেন বলে দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, প্রকৃত পাওনা ও পরিশোধের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই না করে মামলা করা হয়ে থাকলে তা ভুক্তভোগীদের জন্য আরও বড় আর্থিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, শুধু কয়েকজনের অভিযোগ তদন্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কুতুবপুর শাখার সঙ্গে যুক্ত সব গ্রাহকের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করতে হবে।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কে কত টাকা ঋণ নিয়েছেন;
কত টাকা কিস্তি পরিশোধ করেছেন;কার কত টাকা বকেয়া রয়েছে;কার কত টাকা পাওনা রয়েছে;
মাঠকর্মীদের মাধ্যমে কত টাকা লেনদেন হয়েছে;
অর্থ গ্রহণের বিপরীতে যথাযথ রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না;
গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয়েছে কি না;
কোনো গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা হলে তার কারণ ও বর্তমান অবস্থা কী।এসব তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে একটি স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মানববন্ধনে বক্তারা ‘গণউন্নয়ন’ কুতুবপুর শাখার আর্থিক কার্যক্রম তদন্তের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান। একই সঙ্গে মাঠকর্মীদের ভূমিকা, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং সঞ্চয় ও ঋণের হিসাব যাচাইয়ের আহ্বান জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হিসাবের খাতা, রসিদ, ঋণচুক্তি, কিস্তির কাগজপত্র, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের তথ্য, চেক এবং মামলার নথি পরীক্ষা করা হোক।অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত পাওনাদারদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এদিকে মানববন্ধনে ওঠা আর্থিক অনিয়ম, অর্থ ফেরত না পাওয়া, ব্ল্যাংক চেক গ্রহণ, মামলাসংক্রান্ত অভিযোগ এবং মাঠকর্মী শাহানাজের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়ে ‘গণউন্নয়ন’ কুতুবপুর শাখার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।