জাল সিম ও স্ত্রী-মেয়ের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ: নেপথ্যে প্রকৌশলী রকিবুল
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সদস্য (প্রকৌশল) রকিবুল ইসলাম তালুকদারকে ঘিরে থামছেই না জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ। একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
গণমাধ্যমে নিয়মিত অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পরও তার বিরুদ্ধে অদৃশ্য কারণে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না সংস্থাটির শীর্ষ প্রশাসন। ফলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তবে কি খোদ সর্ষের ভেতরেই ভূতের বাস?
ভূতুড়ে সিমের আড়ালে জালিয়াতি
পরিবহন খাতের এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য যেসব মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছেন, তার একটিও নিজ নামে নিবন্ধিত নয়। বায়োমেট্রিক তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, তার বহুল ব্যবহৃত সিমটি পাবনার ঈশ্বরদীর ‘মোঃ সুলতানুল আরেফিন’ (এনআইডি: ১৯৭৭৭৬২৩৯০৭৫৩২৮৬৩) নামের এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হয়ে অন্যের সিম ব্যবহারের নেপথ্যে কোনো বড় ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন আড়াল করা কিংবা অপরাধমূলক কল রেকর্ড গোপন করার জালিয়াতি জড়িত কি না, তা নিয়ে সংস্থাটিতে তোলপাড় চলছে।
স্ত্রী-মেয়ের নামে সম্পদের পাহাড়
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে পৈতৃক বাড়ি হলেও বিগত সরকারগুলোর আমলে ড্রেজিং খাতের বিশাল বাজেট থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনি জটিলতা এড়াতে তিনি সুকৌশলে এসব স্থাবর সম্পত্তি নিজ নামে না রেখে স্ত্রী ও মেয়েদের নামে রেজিস্ট্রি করিয়েছেন। অনুসন্ধানে ঢাকার শান্তিনগরসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও নিয়ন্ত্রণ
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে তিনি শত শত কোটি টাকার অনর্থক ড্রেজিং প্রকল্প পাস ও ভুয়া বিল বাটোয়ারা করেছেন।
এছাড়া, কারাবন্দী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) সোহায়েল আহমেদ (স্ত্রীর বড় ভাই), এইচ টি ইমাম ও মির্জা আজমদের প্রভাব বজায় রেখে পুরো বিআইডব্লিউটিএ-কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন রকিবুল। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি এখন রাতারাতি ‘ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মী’ সেজে প্রশাসনিক চাপ এড়ানোর পথ খুঁজছেন।
জিম্মি প্রশাসন, উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
গণমাধ্যমে টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া ড্রেজিং বিল ও নানাবিধ জালিয়াতির খবর বারবার প্রকাশের পরও বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, নৌপথের শীর্ষ প্রশাসন কি এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি, নাকি পর্দার আড়ালে অন্য কোনো অনৈতিক সমীকরণ লুকিয়ে আছে?
এ অবস্থায় জাল সিমের ব্যবহার, স্ত্রী-মেয়ের নামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ড্রেজিং দুর্নীতির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র সাধারণ কর্মকর্তা ও সচেতন মহল। দ্রুত তাকে পদচ্যুত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে