ময়মনসিংহ নগরীতে ৬০ হাজার টাকার জাল নোটসহ সংঘবদ্ধ চক্রের দুই নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ। নগরীর শম্ভুগঞ্জ এলাকায় পরিচালিত এই অভিযানকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শুধু বাহক বা নিচুতলার সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই কি জাল টাকার ভয়ংকর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব?
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দেশে জাল নোট কারবার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক অপরাধচক্রে রূপ নিয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, সীমান্ত অঞ্চল থেকে স্থানীয় বাজার—বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে এ চক্রের কার্যক্রম। আর মাঠপর্যায়ে যাদের আটক করা হয়, তাদের বড় একটি অংশই কেবল “ক্যারিয়ার” বা পরিবহনকারী। প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, জাল নোট প্রস্তুতকারক এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, জাল নোট শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের আর্থিক লেনদেনে অনাস্থা তৈরি হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য, ভোগান্তিতে পড়েন খেটে খাওয়া মানুষ। বিশেষ করে ঈদ, পূজা কিংবা বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে এই চক্র বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে জাল নোট উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক অভিযানে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—যে চক্রের পেছনে রয়েছে সংগঠিত নেটওয়ার্ক, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তঃজেলা যোগাযোগ ও অর্থের শক্তিশালী প্রবাহ, তাদের মূল শেকড়ে পৌঁছাতে কতটা কার্যকর হচ্ছে তদন্ত?
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু অভিযানে জাল নোট উদ্ধার বা কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেই দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন গোয়েন্দাভিত্তিক সমন্বিত অভিযান, আন্তঃজেলা নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে সীমান্তপথ, অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম এবং গোপন ছাপাখানা শনাক্তেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বলছেন, জাল নোট শনাক্তে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অজান্তে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হন। বাজারে,পরিবহনে কিংবা খুচরা লেনদেনে জাল টাকা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হয় সামাজিক অস্থিরতাও।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, জাল নোট চক্র দমনে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বড় নেটওয়ার্ক শনাক্তের কাজও চলছে। তবে এই ধরনের অপরাধ দমনে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, জনগণ এখন শুধু “গ্রেপ্তার” দেখতে চায় না; তারা পুরো সিন্ডিকেট উন্মোচন এবং দৃশ্যমান বিচার চায়। কারণ, চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও যদি গডফাদাররা অদৃশ্য থেকে যায়, তাহলে অপরাধচক্র আবারও নতুন সদস্য সংগ্রহ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই সময় এসেছে—অভিযানের সাফল্য শুধু উদ্ধার হওয়া টাকার অঙ্ক বা গ্রেপ্তার সংখ্যায় নয়, বরং মূল অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতায় মূল্যায়ন করার। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বাজারব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা রক্ষায় জাল টাকার মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আপসহীন অভিযান এখন সময়ের দাবি।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||