প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১৬, ২০২৬, ৮:৩৩ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২, ২০২৬, ৩:৪৩ অপরাহ্ণ
মহান মে দিবস: উন্নয়নের ভিত হোক শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার

মহান মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এক গৌরবময় এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর অধ্যায়। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যে আত্মত্যাগ করেছিলেন, তা কেবল একটি আন্দোলনের সূচনা নয় বরং মানবমর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং শ্রমের সম্মান প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন সংগ্রামের ভিত্তি।
বাংলাদেশে মহান মে দিবসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের অবদান এ ক্ষেত্রে অসামান্য। তাদের শ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে রয়ে গেছে বহু না-বলা কষ্ট ও বঞ্চনার গল্প।
এখনও দেশের একটি বড় অংশের শ্রমিক ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চাকরির নিশ্চয়তা এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড আমাদের শ্রমখাতের দুর্বলতা ও অবহেলার নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে। এসব ঘটনায় শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
যদিও এসব ঘটনার পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তবুও বাস্তবতা হলো অনেক কারখানায় এখনো শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি উত্থাপন করলে অনেক সময় হয়রানি, চাকরিচ্যুতি বা দমন-পীড়নের শিকার হন। এই পরিস্থিতি একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে শ্রমিকজীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সীমিত আয়ে পরিবার পরিচালনা, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা চরম সংকটে পড়ছেন। অথচ উৎপাদন ও মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকের প্রাপ্য সুষমভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। এই বৈষম্য দূর করতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একটি গণতান্ত্রিক শিল্পব্যবস্থায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে। শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন কেবল অধিকার রক্ষাই করে না এটি শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সংলাপই পারে একটি টেকসই শিল্প পরিবেশ গড়ে তুলতে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে অগ্রসরমান। এই উন্নয়নকে অর্থবহ ও টেকসই করতে হলে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরকালীন নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করে উন্নয়নের সাফল্য পূর্ণতা পায় না।
মহান মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা দেশে এমন একটি শ্রমব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে যেখানে তার কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং যেখানে শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
শ্রমিকের ঘামেই এগিয়ে যায় রাষ্ট্র, সমৃদ্ধ হয় অর্থনীতি। তাই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশের অটল অঙ্গীকার।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||
দুঃখিত আপনি এই সাইট থেকে কন্টেন কপি করতে পারবেন না। দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ ওয়েব সাইট থেকে কন্টেন কপি করা আইনানুক অপরাধ। ধন্যবাদ