কুড়িগ্রামে মাদক পাচারে আধুনিকায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তবে চৌকস পুলিশের দক্ষতায় ধরা পড়ছে সমাজ বিধ্বংসী এসব মাদক। সীমান্ত বেয়ে মাদক আসা বন্ধ করতে বিজিবির পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকেও আন্তরিক হবার দাবী সচেতন মহলের।
কুড়িগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদক পাচারকালে পুলিশের হাতে আটক হয় এসব মাদব দ্রব্য। এরমধ্যে জেলায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে লাশ সাজিয়ে গাঁজা ও ফেনসিডিল, চলন্ত ট্রাকের চাকার ভেতর থেকে গাঁজা ও ফেনসিডিল, সুয়ারেজ পাইপের মধ্যে বিদেশী মদ,মটরসাইকেলের হেডলাইট ও বসার সীটের নিচে এবং তেলের ট্যাংকের ভেতর,ডিম রপ্তানী পিকআপ গাড়িতে গাঁজা এবং ট্রলি পাটাতনের নিচে বিশেষ কায়দায় মাদকদ্রব্য বহনের সময় পুলিশের হাতে আটক হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের এমন আধুনিক অভিনব পদ্ধতি হতবাক আইনশৃংখলা বাহিনী। দিন যতই যাচ্ছে কুড়িগ্রাম থেকে সারাদেশে মাদক পাচারে মাদক ব্যবসায়ীরা আরও নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। চোরাচালান কিংবা অনুপ্রবেশ রোধে বিএসএফ’র কঠোর ভূমিকা থাকলেও মাদক পাচারে তেমন কোন ভূমিকা নেই। এতে করে মাদক রোধে বাংলাদেশের বিজিবি ও পুলিশ বাহিনীকে বেগ পেতে হচ্ছে। অবাধে সীমান্ত বেয়ে জেলায় মাদক সয়লাব হয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। এতে করে মাদক পাচার বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার দুর্নাম বাড়ছে। হাত বাড়ালেই হেরোইন, ইয়াবা, মদ, গাঁজাসহ সবধরণের মাদক পাওয়া যাচ্ছে জেলা জুড়ে। সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য মাদক বেচা কেনার স্পট। আইনশৃংখলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা। আর এসব মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদক বেচা কেনা হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। ফলে দিন দিন বাড়ছে মাদক সেবীদের সংখ্যা। এতে করে মাদক সেবনে ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ,পরিবহন শ্রমিক,ব্যবসায়ী এমনকি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।
জেলায় ১৬টি নদ-নদী দিয়ে বেষ্টিত ৯টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,আসাম এবং মেঘালয় এই তিন রাজ্যের সীমান্ত রয়েছে প্রায় ৩শ কিলোমিটার। এরমধ্যে প্রায় নদী পথসহ সমতলে প্রায় ৫০কিলোমিটার সীমান্তে কাটাতার নেই। জেলার আইনশৃংখলা বাহিনীকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মাদক নির্মূলে চেষ্ঠা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
ফুলবাড়ি উপজেলার বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন,আমরা পুলিশ ও বিজিবিকে মাদক রোধে যেভাবে কঠোর মনোভাব দেখতে পাই সেক্ষেত্রে ভারতীয় বিএসএফ’র মনোভাব দেখা যায় না। কেননা সীমান্ত চোরাচালানে বিএসএফ কঠোর হলেও মাদক পাচারের তেমন মনোভাব দেখা যায় না। মাদক নির্মূল করতে বিজিবি’র পাশাপাশি বিএসএফকেও কঠোর হতে হবে।
ইমাম হোসেন বলেন,বর্তমানে জেলায় মাদক ব্যবসায়ীরা যেভাবে অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করছে তা দেখে আমরা হতবাক। এমন কৌশলে মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক পাচার হচ্ছে। এতে করে আমাদের জেলার সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানী-রপ্তানীকারক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন,আইন শৃংখলাবাহিনীর একার পক্ষে মাদক নিমূর্ল করা সম্ভব নয়। এখানে সম্বনিত উদ্যোগে মাদক রোধে কাজ করতে হবে। এছাড়াও জেলার সরকারি কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিদের ডোপ টেষ্টে আনার দাবী জানান তিনি।
ফুলবাড়ি সদর ইউপি চেয়াম্যান হারুনুর রশীদ হারুন বলেন,ফুলবাড়ি উপজেলা সীমানা বেস্টিত। সীমান্ত বেয়ে খুব সহজেই মাদক আসছে। এতে করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিঘœ। কেননা মাদক সেবন ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফুলবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রানকৃষ্ণ দেবনাথ বলেন,সীমান্ত এলাকায় বিজিবি-বিএসএফ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সমস্যা আছে। এমন প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা মাদক জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপার দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন,মাদক পাচারে জেলার মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কুট কৌশল অবলম্বন করলেও স্মার্ট পুলিশিংয়ের কারণে তারা রেহাই পাচ্ছে না। মাদকের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে জেলা জুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়,গতবছরের নভেম্বর হতে চলতি বছরের পর্যন্ত মাদকের মামলা হয়েছে ৬৫০ টি,গ্রেফতার হয়েছে ১০০০ জন এর বেশি । হেরোইন-১৫৯ দশমিক ৩২ গ্রাম যার মূল্য ৪লাখ ৭৭হাজার ৯৬০টাকা,গাঁজা-এক ৪১৪ কেজি ৩৬ গ্রামের মূল্য এক কোটি ৪১লাখ ৪০লাখ ৩৬০টাকা, ফেন্সিডিল-২১৫৪টি বোতল যার মূল্য ১০লাখ ৭৭হাজার টাকা। ইয়াবা-৫৩হাজার ৬৩৯পিসের মূল্য এক কোটি ৭লাখ ২৭হাজার ৮শ টাকা। ইস্কাপ-৮২৯টি বোতলের দাম-৪১হাজার ৪৫০টাকা।বিদেশী মদ-৮০৪টি বোতলের দাম-৪০হাজার ২শ টাকা এবং ১০ লিটার দেশী মদের দাম ৫শ টাকা। এছাড়া বড় চালানোর মধ্যে প্রায় ৫০০ কেজি গাঁজা সহ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয় । বর্তমান সময়ে কুড়িগ্রাম সহ রৌমারী এবং আশেপাশের এলাকায় এখন মাদকের আখড়া। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে এই এলাকার মানুষজন সকলে মাদকাসক্ত হয়ে যাবে। যারা মাদকের বাহিরে রয়েছে তারাও মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদক সেবীদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||