(মানুষ ও রাষ্ট্রের জীবনযাত্রায় এই যে অস্থিরতা, তা কেবল সাময়িক কোনও সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস যা আগামী কয়েক দশক পৃথিবীকে ভোগাবে)
আব্দুল্লাহ আল মামুন (সম্পাদক দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ)
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরাইলের এই সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপটকে সেই ঐতিহাসিক থুসিডাইডিস ট্র্যাপের ফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ইরান ও ইসরায়েলের এই সরাসরি সংঘাত কোনও আকস্মিক অগ্নুৎপাত নয়, বরং এটি শতাব্দীর সঞ্চিত ভূ-রাজনৈতিক লাভার বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ করতে হলে আমাদের প্রথমেই যে তত্ত্বটির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস স্পার্টা ও এথেন্সের যুদ্ধ বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, যখন একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি তার ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব রক্ষায় মরিয়া হয় এবং একটি উদীয়মান শক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আজকের বিশ্বমঞ্চে আমেরিকা সেই প্রতিষ্ঠিত শক্তি, যে তার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একক মেরুকেন্দ্রিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ হারাতে বসেছে। তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে নৃসংশ এবং অকল্পনীয় অধ্যায়টি রচিত হলো যখন আমেরিকার সরাসরি মিসাইল হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি শাহাদাত বরণ করলেন। এটি কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানের ওপর হামলা নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম জাহানের একটি বিশাল অংশের আবেগের ওপর সরাসরি আঘাত। আমেরিকা আজ গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেও মূলত এই ‘ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ থেকেই নিজেকে বাঁচাতে এবং ইরানের নেতৃত্বকে সমূলে বিনাশ করতেই এই আত্মঘাতী যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের প্রতিশোধের কৌশলটি কেবল সামরিক শক্তির মহড়া নয়, এটি হবে একটি ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধ। ইরান ভালো করেই জানে যে আমেরিকার সঙ্গে সম্মুখ সমরে জেতা কঠিন, তাই তারা তাদের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করে আমেরিকার প্রতিটি স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একটি ‘ফায়ার ওয়াল’ তৈরি করা হবে। সাইবার যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার ফিন্যান্সিয়াল গ্রিড এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা এখন তেহরানের টেবিলে। এই প্রতিশোধ হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী। প্রতিটি মার্কিন সেনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মাটি হয়ে উঠবে তপ্ত কড়াইয়ের মতো। যখন কোনও জাতি তার সর্বোচ্চ অভিভাবককে হারায়, তখন সেই শোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে এমন এক গণজাগরণ তৈরি করে যা বিশ্বের সর্বাধুনিক অস্ত্র দিয়েও দমন করা সম্ভব নয়।
এই অভাবনীয় হত্যাকাণ্ডের পর ইরান এখন যে ‘কঠিন প্রতিশোধ’ বা ‘হার্ড রিভেঞ্জ’র ঘোষণা দিয়েছে, তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানের প্রতিশোধের প্রথম ধাপ হতে পারে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে থাকা মার্কিন রণতরী এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের একযোগে আক্রমণ। হিজবুল্লাহ, হুতি এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ এখন ইসরায়েলের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। আয়াতুল্লাহর রক্তের বদলা নিতে ইরান হয়তো তাদের পরমাণু নীতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেবে, যা হবে পশ্চিমের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ড্রোনের গুঞ্জনে নয়, বরং আকাশচুম্বী আগুনের লেলিহান শিখায় ঢেকে যাবে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান যদি তেল আবিব এবং হাইফার মতো শহরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জেফরি স্যাকস তার বিশ্লেষণে বারবার দেখিয়েছেন যে, আমেরিকার এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং ‘রেজিম চেঞ্জ’র নেশা মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক বিন্দুতে নিয়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনও পথ খোলা নেই। ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেক সরকারকে হটিয়ে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ নেতার ওপর মিসাইল হামলা সেই দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী লালসারই এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ।
এখানেই শেষ নয়, এই আক্রমণের পেছনে কাজ করছে এক তীব্র ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো পদ্ধতিগতভাবে ইরানকে একটি ‘অশুভ সত্তা’ হিসেবে চিত্রায়িত করে আসছে। সর্বোচ্চ নেতার ওপর এই পৈশাচিক মিসাইল হামলাকে তারা ‘টার্গেটেড কিলিং’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র। যখন আপনি একটি দেশের অভিভাবককে হত্যা করেন এবং সেটাকে ‘শান্তির জন্য প্রয়োজনীয়’ বলে প্রচার করেন, তখন সেই প্রোপাগান্ডা মূলত সত্যকে আড়াল করার একটি পর্দা মাত্র। জেফরি স্যাকস সতর্ক করেছেন, এই ধরনের প্রোপাগান্ডা বিশ্ববিবেকের কাছে এই অন্যায় যুদ্ধকে বৈধ করার এক হীন প্রচেষ্টা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যে ভয় দেখানো হচ্ছে, তা মূলত ইরাকের সেই তথাকথিত ‘ম্যাস ডেসট্রাকশন ওয়েপন’ (WMD)-এর মতোই একটি মিথ্যা অজুহাত হতে পারে। আসল উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েলের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব বা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ নিশ্চিত করা এবং ইরানের আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করা।
থুসিডাইডিস ট্র্যাপের এই প্রেক্ষাপটে আমরা যদি পরাশক্তিদের ভূমিকার দিকে তাকাই, তবে দেখব রাশিয়া ও চীন এই মিসাইল হামলাকে তাদের নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। একজন সর্বোচ্চ নেতার ওপর সরাসরি হামলা মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমস্ত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করা। ইরানের পতন মানে হলো রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া এবং চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই এটি কেবল ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধ নয়, বরং এটি একটি মাল্টি-পোলার বা বহুমেরু বিশ্ব গঠনের প্রসব বেদনা। জেফরি স্যাকস তার বিভিন্ন লেখনীতে উল্লেখ করেছেন যে, আমেরিকা যদি তার হস্তক্ষেপবাদী নীতি ত্যাগ না করে, তবে তারা নিজেই নিজের পতনের পথ প্রশস্ত করবে। সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের ক্ষমতার সীমার বাইরে গিয়ে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে, তখনই তাদের পতন শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্য বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘রিসোর্স ন্যাশনালিজম’ বা সম্পদের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব। ইরানের ভূগর্ভে কেবল তেলের সাগর নয়, বরং রয়েছে লিথিয়ামের মতো অমূল্য খনিজ সম্পদ, যা আগামী দিনের গ্রিন এনার্জি বা সবুজ জ্বালানি বিপ্লবের মেরুদণ্ড। আমেরিকা তার ক্ষয়িষ্ণু ডলার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তারা দেখছে ইরান তার বাণিজ্যিক লেনদেনে ডলারের বিকল্প খুঁজছে এবং ব্রিকস (BRICS)-এর মতো শক্তিশালী জোটে যোগ দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার ওপর এই মিসাইল হামলা মূলত সেই অর্থনৈতিক বিদ্রোহ দমনেরই একটি সামরিক সংস্করণ। ফলে ইরান আক্রমণ কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এটি একটি কারেন্সি ওয়ার বা মুদ্রাযুদ্ধ। আমেরিকা চাচ্ছে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই বার্তা দিতে যে, যারা ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং সার্বভৌমত্বের কথা বলবে, তাদের সর্বোচ্চ নেতাদেরও রেহাই দেওয়া হবে না।
তাই ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনও আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ছক। সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাত মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের মধ্যে যে মার্কিনবিরোধী চেতনার জন্ম দিয়েছে, তা অচিরেই এক সর্বাত্মক বিপ্লবে রূপ নেবে। এই যুদ্ধটি মূলত পুরনো বিশ্বব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন এক ব্যবস্থা গড়ার সংঘাত। যেখানে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার কেবল মোড়ক, আর ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার নগ্ন আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের তীব্র ক্ষুধা।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় এক প্রলয়ঙ্কারী স্পিল ওভার ইফেক্ট বিশ্বব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আজ যে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েছে, তাকে জেফরি স্যাকস বর্ণিত ‘গ্লোবাল ইকোনমিক ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক খণ্ডবিখণ্ডিতকরণের চূড়ান্ত রূপ বলা যেতে পারে। আমরা যখন আধুনিক অর্থনীতির কথা বলি, তখন আমরা আসলে একটি নিবিড়ভাবে সংযুক্ত স্নায়ুতন্ত্রের কথা বলি। মিসাইল হামলায় শীর্ষ নেতৃত্বের বিয়োগান্তক ঘটনার পর ইরান যখন হরমুজ প্রণালীতে প্রতিশোধের জাল বুনছে, তখন সেই স্নায়ুতন্ত্রে যে কম্পন অনুভূত হচ্ছে, তা কেবল তেলের দামের গ্রাফে নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই যুদ্ধের ‘স্পিল ওভার ইফেক্ট’ বা উপচে পড়া প্রভাব এতটাই ভয়াবহ যে, এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার সচল চাকাটিকে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং প্রলয়ঙ্কারী কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে এই সরু জলপথটিকে কেবল একটি রেখা মনে হতে পারে, কিন্তু এটি মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার এক মহাধমনী। পৃথিবীর মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি তার সর্বোচ্চ নেতার হত্যার প্রতিশোধে এই পথটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২৫০ ডলার অতিক্রম করা কেবল সময়ের ব্যাপার। জেফরি স্যাকস বারবার সতর্ক করেছেন, জ্বালানি মূল্যের এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি সরাসরি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশনকে উসকে দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি হবে একটি অর্থনৈতিক মরণফাঁদ। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, যার ফলে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যারা গত কয়েক বছরের বিশ্বমন্দা সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল, তাদের জন্য এই যুদ্ধ হবে এক চূড়ান্ত আঘাত।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংকট বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রেও ইতিমধ্যে এক অসীম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমেরিকা তার অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে ‘ডলারকে অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম ‘সুইফট’ (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা এবং শীর্ষ নেতাকে সশরীরে নির্মূল করার এই আস্ফালন মূলত একটি ‘ফিন্যান্সিয়ালটেররিজম’। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা এখন বিশ্বজুড়ে ‘ডি-ডলারাইজেশন’-এর এক অভূতপূর্ব জোয়ার দেখতে পাচ্ছি। রাশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলো এখন তেলের বিনিময়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ‘ব্রেটন উডস’ সিস্টেমের পতনের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। আমেরিকা যখন মিসাইল দিয়ে ইরানকে শাসন করতে চাচ্ছে, তারা তখন বুঝতেই পারছে না যে তারা আসলে ডলারের বিশ্বজনীন আস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকছে।
ভবিষ্যৎ সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো ‘লজিস্টিক ডিসরাপশন’ বা পরিবহন ব্যবস্থার অচলাবস্থা। লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের নিরাপত্তা আজ বিপন্ন। বীমা কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের জন্য প্রিমিয়াম দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠানোর খরচ অসহনীয় হয়ে পড়েছে। পণ্যবাহী জাহাজগুলো এখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সময় এবং অর্থ—উভয়ই অপচয় করছে। এই বিলম্বের কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্যের সংকটে তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে পিষ্ট করছে। মানুষ ও রাষ্ট্রের জীবনযাত্রায় এই যে অস্থিরতা, তা কেবল সাময়িক কোনও সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস যা আগামী এক দশক পৃথিবীকে ভোগাবে।
রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও এই সংকট এক চরম অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে এখন তাদের উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করে প্রতিরক্ষা ও সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। এই যুদ্ধের কারণে যে পরিমাণ অর্থ কামানের গোলা আর মিসাইলে খরচ হচ্ছে, তা দিয়ে সারা বিশ্বের ক্ষুধার সমস্যা একাধিকবার সমাধান করা সম্ভব ছিল। জেফরি স্যাকসের মতো উন্নয়নের প্রবক্তারা মনে করেন, যুদ্ধের পেছনে এই বিশাল বিনিয়োগ মূলত মানবতার বিরুদ্ধে এক নীরব অপরাধ। মানুষের জীবনযাত্রার মান আজ চরমভাবে হ্রাস পাচ্ছে কারণ সরকারগুলো জনস্বাস্থ্যের চেয়ে অস্ত্র সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই ‘ওয়ার ইকোনমি’ বা যুদ্ধ অর্থনীতি সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অর্থ কেড়ে নিয়ে সামরিক শিল্পগোষ্ঠীর সিন্দুক ভরছে। মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য হাহাকার করছে, তখন পরাশক্তিগুলো নতুন নতুন ড্রোনের ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করছে।
আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইরান যুদ্ধ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়, এটি মূলত আধুনিক সভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। আমেরিকা এখানে কেবল গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের মুখোশ পরেছে, কিন্তু তার আসল লক্ষ্য হলো সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখা। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, এই যুদ্ধই হয়তো সেই পরাশক্তির অর্থনৈতিক পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো পরাশক্তিদের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। রাশিয়া ও ইরান আজ কেবল সাধারণ মিত্র নয়, বরং এক কৌশলগত সামরিক অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জন্য ইরানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের পর রাশিয়া যদি ইরানকে তাদের ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ বা পারমাণবিক ছাতার নিচে নিয়ে আসার ঘোষণা দেয়, তবে বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হবে। সিরিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলে রাশিয়ার যে সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, তা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চীন, যার বিশাল জ্বালানি চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস ইরান, সে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) রক্ষায় সক্রিয় হবে। চীন হয়তো সরাসরি পদাতিক সৈন্য পাঠাবে না, কিন্তু তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাবে যেখান থেকে আমেরিকার জন্য বিজয় অর্জন করা অসম্ভব হবে। এটিই মূলত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই আধুনিক সংস্করণ, যেখানে যুদ্ধ কেবল ফ্রন্টলাইনে নয়, বরং স্যাটেলাইট, ডেটা সেন্টার এবং কারেন্সি মার্কেটেও লড়তে হবে।
প্রকৃতপক্ষে আমরা এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি এবং তার সঙ্গে নিউক্লিয়ার ডিটারেন্সের ব্যর্থতা একটি নতুন অনিশ্চিত বিশ্বের নতুন আত্মপ্রকাশকে ইঙ্গিত করছে। সর্বোচ্চ নেতার ওপর মিসাইল হামলা কি আমাদের সেই ভয়াবহ ১৯৩৯ সালের দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? এই প্রশ্নটি আজ কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব। জেফরি স্যাকস তার বিভিন্ন আলোচনায় বারবার সতর্ক করেছেন, যখন কোনও বৃহৎ শক্তি তার ক্ষয়িষ্ণু আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তারা প্রায়ই এমন সব হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয় যা একটি বৈশ্বিক দাবানল সৃষ্টি করে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বা 'ওয়ার্ল্ড অর্ডার' এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্ব তার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে একটি বহুমেরু বিশ্বের জন্ম হচ্ছে। ইরানের এই রণক্ষেত্র মূলত এই দুই বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা এতদিন ধরে যে 'নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স' বা পারমাণবিক প্রতিবন্ধকতার ওপর ভরসা করে বড় যুদ্ধ এড়িয়েছি, বর্তমান সংঘাত প্রমাণ করছে যে সেই ধারণাটি এখন ব্যর্থ। যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাকে মিসাইল দিয়ে হত্যা করা সম্ভব হয়, তখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার কেবল গুদামের শোভাবর্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত হতাশাজনক এবং বিপজ্জনক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে আমেরিকার লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত। অথচ এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপের সাধারণ মানুষ। পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' বা সমষ্টিগত নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া, কিন্তু তারা এখন 'জিরো সাম গেম' খেলায় লিপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর ভূমিকা একটি নতুন রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলো আর পশ্চিমা ডিক্টেশন মেনে নিতে রাজি নয়। তারা বুঝতে পারছে যে এই যুদ্ধ তাদের বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। গ্লোবাল সাউথের এই নীরব বিদ্রোহ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেবে। জেফরি স্যাকসের মতে, পশ্চিমাদের এই 'একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা' এবং 'সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব' প্রদর্শনের নীতিই মূলত অন্য পরাশক্তিগুলোকে একজোট হতে বাধ্য করছে। আমেরিকা আজ নিজেই নিজের শত্রু তৈরি করছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী? আমরা দেখতে পাচ্ছি জাতিসংঘ আজ লিগ অফ নেশনসের মতোই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার লড়াই বিশ্বকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইনের আজ কোনো মূল্য নেই। এই সংঘাত পরবর্তী বিশ্ব হয়তো আর কখনোই আগের মতো হবে না। আমরা সম্ভবত এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি যেখানে কোনো একক বিশ্ব পুলিশ থাকবে না। এর ফলে ছোট দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে, আবার অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটবে। পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি'র ওপর জোর দেওয়া, কিন্তু তারা এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা কগনিটিভ ওয়ারফেয়ারের যুগে সত্য আজ বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মানুষ ভুলে যাচ্ছে যে যুদ্ধের কোনো চূড়ান্ত বিজয়ী নেই, আছে কেবল বিজিত মানবতা।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয় হলো আরব বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পরাশক্তিদের সঙ্গে যে গোপন আঁতাত করেছে, তা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯১৬ সালের সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে যেভাবে অটোমান সাম্রাজ্যকে খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছিল, আজ ২০২৬ সালেও আমরা সেই একই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি দেখতে পাচ্ছি। পরাশক্তিগুলো যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে, তখন কিছু প্রতিবেশী দেশের নীরবতা বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন মূলত তাদের নিজেদের ভবিষ্যতের কফিনে পেরেক ঠোকার সমান। জেফরি স্যাকস তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, আঞ্চলিক অনৈক্যই বাইরের হস্তক্ষেপকারীদের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি? বাস্তবতা হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই পদধ্বনি কেবল ইরানে নয়, বরং প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের দরজায় কড়া নাড়ছে। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত পৃথিবীকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারে। পরাশক্তিদের এই ইগোর লড়াই এবং এক দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে অন্য দেশের মিসাইল দিয়ে হত্যার এই সংস্কৃতি যদি না থামে, তবে ইতিহাসের পাতায় আমাদের পরিচয় হবে সেই প্রজন্ম হিসেবে, যারা নিজেদের হাতে নিজেদের বিনাশ দেখেছিল। এখন সময় এসেছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ছেড়ে এক টেবিলে বসে মানবতার স্বার্থে কথা বলার।
ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ পরবর্তী বিশ্ব এক অসীম অনিশ্চয়তার খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। এই সংকটের ভবিষ্যৎ কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, বরং মানব সভ্যতার নৈতিক ও কাঠামোগত ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। আমরা যদি বর্তমানের এই রণহুঙ্কার থামিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তবে দেখব এক ভয়াবহ ‘ভ্যাকুয়াম’ বা শূন্যতা। এই শূন্যতা পূরণের জন্য এবং একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক মহাপ্রলয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য আমাদের এখন তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এক নির্মোহ ও বাস্তবায়নযোগ্য পথচিত্র। জেফরি স্যাকস যেমনটি বারবার জোর দিয়েছেন—যুদ্ধের ব্যয় কূটনীতির চেয়ে হাজার গুণ বেশি। তাই আমাদের প্রথম এবং প্রধান করণীয় হলো ‘মাল্টি-লেয়ারড ডিপ্লোম্যাসি’ বা বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে একটি নতুন বৈশ্বিক চুক্তি বা ‘নিউ গ্লোবাল ডিল’ প্রতিষ্ঠা করা।
বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে আমাদের একটি ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি আর্কিটেকচার’ বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এটা বুঝতে হবে যে, বাইরের পরাশক্তিগুলো তাদের অস্ত্র বিক্রির বাজার আর ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে এই অঞ্চলকে ব্যবহার করে। তাই ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটি সরাসরি ‘রেড লাইন’ বা হটলাইন স্থাপন করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় চীন এবং ব্রিকস (BRICS) দেশগুলোকে ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হিসেবে কাজ করতে হবে। কেন চীন? কারণ চীন বর্তমান বিশ্বের একমাত্র শক্তি যার সাথে এই অঞ্চলের প্রতিটি বিবদমান পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। চীনের ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’ (GSI)-কে কেন্দ্র করে একটি মধ্যপ্রাচ্য শান্তি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব, যা কেবল পশ্চিমা এজেন্ডার ওপর নির্ভরশীল হবে না। এটি হবে একটি ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা, যেখানে কারও অস্তিত্ব মুছে ফেলার বদলে সবার সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকবে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ‘জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা কাউন্সিল’ গঠন করা জরুরি। হরমুজ প্রণালী বা সুয়েজ খালের মতো স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টগুলোকে ‘গ্লোবাল কমনস’ বা বৈশ্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এই পথগুলোকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে, যাতে কোনো যুদ্ধাবস্থায় কোনো পক্ষই এই ধমনীগুলো বন্ধ করার দুঃসাহস না দেখায়। জেফরি স্যাকসের ভাষায়, আমেরিকার উচিত তাদের ‘একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা’ বা অর্থনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সংস্কার করা। একটি ‘মাল্টি-কারেন্সি বাস্কেট’ বা বহুমুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে ডলারের ওঠানামা আর কোনো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে না পারে। এটি কেবল ইরানকে বাঁচানোর পরিকল্পনা নয়, এটি সমগ্র বিশ্বকে একচেটিয়া অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির বাস্তবমুখী পরিকল্পনা।
তৃতীয়ত, আমাদের ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। পরাশক্তিগুলো প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে যে ঘৃণা ছড়ায়, তার বিপরীতে একটি ‘গ্লোবাল পিস নারেটিভ’ বা শান্তির বয়ান তৈরি করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে আমাদের এখনই ‘অস্ত্রের বদলে উন্নয়ন’ মডেল গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বনেতাদের বাধ্য করতে হবে যাতে তারা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করে। এটি কোনো ইউটোপিয়া নয়, বরং টিকে থাকার একমাত্র বাস্তব পথ। কারণ যুদ্ধের ফলে যে উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত উন্নত দেশগুলোর সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও ধ্বংস করে দেয়।
আমরা যদি আজ এই বাস্তবমুখী পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ না করি, তবে আগামী দিনের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে বিলাপ করার মতো কেউ বেঁচে থাকবে না। উত্তরণের পথটি সংকীর্ণ হতে পারে, কিন্তু সাহসিকতার সাথে সেই পথে হাঁটাই এখন একমাত্র বিকল্প। মধ্যপ্রাচ্যের এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতা, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, নিজেদের ক্ষমতা ও রাজতন্ত্র ধরে রাখার নামে পশ্চিমা শক্তিদের পদলেহনের ধারাবাহিক ইতিহাসের কথা ইত্যাদি বিবেচনা করলে একটি প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খায়। আর সেই প্রশ্নটি হলো, পরবর্তী টার্গেট কে? সৌদি আরব, নাকি তুরস্ক? পাঠক, প্রশ্নটি আপনাদের নিকট রেখে দিলাম।
পরিশেষে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বা ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ আজ মৃতপ্রায়। এর ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি ন্যায়সঙ্গত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। আয়াতুল্লাহর ওপর মিসাইল হামলার পর ইরানে যদি পশ্চিমা শক্তির সরাসরি মদদে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং ইরান তার ‘কঠিন প্রতিশোধ’ শুরু করে, তবে তার প্রভাব কেবল ইরানের সীমানায় থাকবে না, তা হবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র ও ক্ষমতা কাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত। পরাশক্তিদের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল পথপ্রদর্শকের, কিন্তু তারা আজ দস্যুর ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাই ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর ঐক্যই হতে পারে এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে একজোট হয়ে বলতে হবে—আমরা তোমাদের যুদ্ধের ভাগীদার হব না।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||