দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকা সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে খন্দকার জুলফিকার মতিন ।
তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি
তিনি তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ এর সভাপতি তিনি বাংলাদেশ রেল গ্যাস খনিজ সংস্থা শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি এছাড়াও তিনি একাধিক অঙ্গ সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাস্তবসম্মত কি করা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠনের’ আহ্বান জানাচ্ছি।
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। এজন্য দেশের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে তাদেরই এ উদ্যোগ নিতে হবে। জনাব মতিন আরো বলেন নির্বাচনের আগে দলগুলোর ইশতেহারে এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত নিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনা ছিল এখন সেগুলোর সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে ।
সরকার পরিবর্তন হলে নীতিমালাও যদি বদলে যায়, তাহলে পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না ,
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখনও গভীর সংকটে রয়েছে।
গ্যাস ,বিদ্যুৎ ,পেট্রোলিয়াম একটি জটিল বিষয়। একদিকে বাণিজ্যিক পণ্য, অন্যদিকে এটি রাষ্ট্র পরিচালিত একটি জনসেবামূলক ব্যবস্থা। সরকারকে একদিকে উৎপাদন ও ব্যয়ের হিসাব রাখতে হয়, অন্যদিকে জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়।’
এই ভারসাম্য রক্ষা করতে গভীর চিন্তাভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা পাঁচ বছরের মেয়াদে সম্ভব নয় ।
সরকার পরি সেক্ষেত্রে আমলাদের অনেক নীতি এবং সততার মধ্যে থাকতে হবে । আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সব সময় সুন্দর কাজকে পিছিয়ে দেয়।
জাতীয় ইস্যুতে সব রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নতুন সরকারের সঙ্গে নীতি পরিবর্তন সমস্যার সমাধান করে না বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে। বর্তমান সরকারকে জ্বালানি খাত নিয়ে অনেক সুচারু ভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে আগাতে হবে।
বাস্তবভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেতে হবে । যা সরকারের নীতি প্রণয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ সরকার কিংবা বিরোধীদল, যে অবস্থায়ই থাকুক জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মতক সহযোগিতা করতে হবে সবার।
প্রাথমিক জ্বালানি খাতে অবহেলার কারণেই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য এফএসআরইউর সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত-এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।’
২০০১ সালের পর থেকে কোনো বাস্তবসম্মত রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা সমীক্ষা করা হয়নি। গত ১৬ বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। জ্বালানি খাতে বরাদ্দ সীমিত থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়লা খাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং ১৯৯৬ সালের পর থেকে কোনো সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়নি। ‘নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও বিকল্প জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। বিশেষ করে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্তানুযায়ী রপ্তানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখনই নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭/৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে।
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জানান, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কমপক্ষে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ গড় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৫০০-২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার প্রায় ৫৯-৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
‘গৃহস্থালি খাতে গ্যাস ব্যবহারের হার দেখানো হয় প্রায় ১১ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা ৫-৬ শতাংশের বেশি নয়। অন্যদিকে, গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস দেখানো হচ্ছে প্রায় ৮.৫ শতাংশ। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের ৩০-৩৩ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি। ফলে এই ১০ শতাংশ ক্ষতি সরাসরি এলএনজির ক্ষতির সমান, যার আর্থিক মূল্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।’
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তিনি আরও বলেন, এ লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনাব মতিন দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিগত সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখা উচিত।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। যদিও দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু গ্যাস সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানির দামের ওঠানামা এই খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে এলএনজি আমদানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সৌর, বায়োমাস ও পারমাণবিক শক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল থাকলে দ্রুত শিল্পায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
নতুন সরকারকে কঠিন সময় অতিক্রম করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যুৎসংক্রান্ত কোনো চুক্তি বাতিলের আগে চলমান পরিস্থিতি যাচাই ও পর্যালোচনা করা জরুরি, নচেৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং জনগণ ভোগান্তিতে পড়বে।’ তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা (মাইক্রোম্যানেজমেন্ট) এবং কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে কয়েকটি গুরুতর ও অমীমাংসিত সংকটের মুখোমুখি, যা ধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ এবং বিদ্যুৎ খাতের গভীর আর্থিক সংকট সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকটের মূল কারণ নীতির অভাব নয়, বরং ২০১০ সাল থেকে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পেলেও ব্যয় বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ।’
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ এর মতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী সরকারের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||