সাভারের আশুলিয়া মানেই এখন শিল্পাঞ্চল আর কলকারখানার কর্মব্যস্ততা। কিন্তু এই ইট-পাথরের নগরের বুকেই টিকে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এক ইতিহাস— বাংলা বাজার বাঁশের হাট। বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বাজারটি আজও জানান দেয় বাংলার লোকজ সংস্কৃতির শেকড়ের কথা।
ইতিহাসের সাক্ষী এই হাট
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, পাকিস্তান আমল তো বটেই, তারও অনেক আগে থেকেই এই বাজারে বাঁশের জমজমাট কারবার চলত। একসময় যখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ, তখন উত্তরাঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় বাঁশের ‘চাল’ (বাঁশ বেঁধে তৈরি ভেলা) নদীতে ভাসিয়ে এখানে আনা হতো।
বাজারে যা পাওয়া যায়
সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কয়েক হাজার বাঁশ। জাতভেদে এখানে পাওয়া যায়:
* তল্লা বাঁশ: ঘরবাড়ি নির্মাণ ও প্যান্ডেলের কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।
* মুলি বাঁশ: কারুপণ্য ও ঝুড়ি তৈরির জন্য জনপ্রিয়।
* বরাক ও কাটি বাঁশ: আসবাবপত্র ও শক্তিশালী কাঠামোর জন্য ক্রেতাদের পছন্দ।
এছাড়া এখানে বাঁশ দিয়ে তৈরি মাছ ধরার চাই (আন্তা), খাঁচা এবং গৃহস্থালির টুকিটাকি পণ্যও বিক্রি হয়। বর্তমানে অনেক কারিগর এখানে বসেই বাঁশ চেরাই করে নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল তৈরি করেন।
বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জ
ঐতিহ্যবাহী হলেও এই শিল্পটি এখন নানা প্রতিকূলতার মুখে। বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে—
* প্লাস্টিকের আধিপত্য: বাজারে প্লাস্টিক ও লোহার পাইপের সহজলভ্যতার কারণে বাঁশের চাহিদা আগের চেয়ে কমেছে।
* পরিবহন ব্যয়: আগে নদীপথে কম খরচে বাঁশ আসত, এখন সড়কপথে ট্রাক ভাড়ার কারণে বাঁশের দাম বেড়ে গেছে।
* পৃষ্ঠপোষকতার অভাব: আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিতে না পেরে অনেক কারিগর এখন পেশা বদলে ফেলছেন।
প্রত্যাশা
আশুলিয়ার এই বাঁশ শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। স্থানীয়দের দাবি, এই পুরনো বাজারটিকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে এই প্রাচীন শিল্প।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||