মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ময়মনসিংহ বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয় কি সত্যিই মাদক নির্মূলে কাজ করছে—নাকি মাসোয়ারা বাণিজ্য,অদৃশ্য প্রভাবশালী মহল ও গোপন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি হয়ে পড়েছে—এ নিয়ে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক একটি ভয়েস রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।বফাঁস হওয়া ভয়েস রেকর্ড—এএসআই আমেনার সরাসরি স্বীকারোক্তি। ২০ নভেম্বর ফাঁস হওয়া ভয়েস রেকর্ডে ডিএনসির এএসআই আমেনা বেগমকে পরানগঞ্জ এলাকার এক মদ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মাসোয়ারা লেনদেন, হুমকি এবং কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ওই অডিওতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন—“আগে যা দিছস, এবারও তাই দিবি…আমার লাইনে চলবি—না হলে মামলা হইব।” এমন বক্তব্য প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ডিজি অফিসে ‘অদৃশ্য শক্তি’—কার ছত্রছায়ায় এরা? ভয়েস রেকর্ডের এক পর্যায়ে এএসআই আমেনার আরেকটি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে—“রনি শুনলে আমার চাকরি চলে যাবে। উনি ডিজি অফিসে খুব প্রভাবশালী… যে কাউকে বদলি করতে পারে।” এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়—অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে বদলি–পদায়ন, রিপোর্ট ও অভিযানের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। অভিযোগ উঠেছে, একই জেলার কয়েকজন কর্মকর্তা স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে একটি গোপন সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বাসিন্দা সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনি। একই জেলার এএসআই আমেনা (ঈশ্বরগঞ্জ) এবং এএসআই ফারুক (নান্দাইল) দীর্ঘদিন একইসঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় সন্দেহ আরও গাঢ় হয়েছে। সিন্ডিকেটে ‘সেফ জোন’—মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রকাশ! স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন—ময়মনসিংহ শহর ও আশপাশে প্রায় ২০ জন কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ীকে মাসোয়ারার বিনিময়ে “সেফ জোন” ঘোষণা করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে—ময়না-বুচি, নজরুল-নাজু, ডালিয়া, রুমা, রুজি, কুদু, হামে, রেহেনা, দুখিনী, মোখলেস, আহাদ, হাফিজুল, কাইয়ুমসহ আরও অনেকে। স্থানীয়দের দাবি—মাসোয়ারার টাকা নিয়মিতভাবে কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে বণ্টন করা হতো।
মাদক উদ্ধার ও মামলায় অমিল—প্রশ্ন আরও বাড়ছে! উদ্ধার করা মাদকদ্রব্য ও মামলার চার্জশিটে উল্লেখ থাকা পরিমাণে নিয়মিত অমিল পাওয়া গেছে। উদাহরণ—উদ্ধার ২০ কেজি গাঁজা — মামলায় ১৮ কেজি! উদ্ধার ২,০০০ ইয়াবা — মামলায় ১,৯৫০টি! বিদ্বেষী মহল বলছে—এসব অমিল মাদকদমন কার্যক্রমের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অধীনস্থদের সম্পদবৃদ্ধি—এএসআই ফারুক নিয়ে বিস্তর অভিযোগ! বিশেষ করে এএসআই ফারুকের হঠাৎ সম্পদবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি—শম্ভুগঞ্জ, গোয়ালকান্দি,সানকিপাড়া ও নিজ গ্রামে তার একাধিক জমি–বাড়ি রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—“একজন এএসআইয়ের বেতনে এত সম্পদ কোথা থেকে আসে?” অভিযোগ উঠলেও সাম্প্রতিক নাটকীয় বদলিতে তাকে “সেফ করতে” অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন—“বদলি দিয়ে দায় এড়ানো যায় না, তদন্তই একমাত্র সমাধান।” সহকারী পরিচালক রনির ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত আচরণ নিয়ে সমালোচনা! সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনির ব্যক্তিজীবন নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা বিতর্ক রয়েছে—পারিবারিক অস্থিরতা,স্ত্রীর মামলা,সম্পর্ক ভাঙনসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এ ধরনের ব্যক্তিগত অস্থিরতা কি তার পেশাগত আচরণে প্রভাব ফেলছে?
“দীপ পুনর্বাসন কেন্দ্র” বন্ধ—রনির রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক! জেলা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান “দীপ পুনর্বাসন কেন্দ্র” বন্ধে রনির রিপোর্টকে ‘মনগড়া’ বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. আরিফ সিদ্দিকী। তার অভিযোগ—“ডিএনসির কিছু ব্যক্তি প্রতিহিংসা থেকে কেন্দ্রটি বন্ধ করিয়েছেন।” অন্যদিকে সরজমিনে দেখা গেছে—যেসব অনিয়মধর্মী পুনর্বাসন কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের মুখে—সেগুলোতে অভিযান না চালানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযুক্তদের অস্বীকার—তবে তদন্তের দাবি আরও জোরালোঃ অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে—ফাঁস হওয়া ভয়েস রেকর্ড, উদ্ধার–মামলার অমিল, দীর্ঘদিন একই জেলায় পোস্টিং, অভিযোগিত সেফ জোন, আকস্মিক সম্পদবৃদ্ধি—এসব মিলিয়ে তদন্তের দাবি আরও তীব্র হয়েছে। প্রস্তাবিত তদন্তের ক্ষেত্র—১. ভয়েস রেকর্ডের ফরেনসিক পরীক্ষা। ২. সংশ্লিষ্ট সকল মামলার পূর্ণ রিভিউ। ৩.উদ্ধার ও জব্দ তালিকার অডিট। ৪.সংশ্লিষ্টদের সম্পদ তদন্ত। ৫.বদলি–পদায়নে অদৃশ্য প্রভাব খতিয়ে দেখা। ৬.পুনর্বাসন কেন্দ্র সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যাচাই। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নঃ বিশেষজ্ঞদের মতে—“মাদকবিরোধী বাহিনীতে অনিয়ম থাকলে তা সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।” তাদের মন্তব্য—“কেবল অভিযান নয়—বাহিনীর ভেতরে দুর্নীতির শেকড়ও উপড়ে ফেলতে হবে।” তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই অফিসে অভিযুক্তদের বহাল রেখেই বরং সফল, সৎ, সাহসী ও ইন্টেলিজেন্স-নির্ভর কর্মকর্তা–কর্মচারীদের রহস্যময়ভাবে বদলি করা হচ্ছে। যেসব কর্মকর্তা মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রকৃতপক্ষে অবদান রেখেছেন—তাদের হঠাৎ প্রত্যাহার ও স্থানান্তর স্থানীয়দের মাঝে তীব্র প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মাদকচক্রের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান ছিল কঠোর—তাদেরই বদলি, আর অভিযুক্তদের নিরাপদ অবস্থান—এ চিত্রই এখন আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||