
মুহাম্মাদ রমজান মাহমুদ - মানিকগঞ্জ :
মানিকগঞ্জের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান,মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জেলা প্রশাসক বরাবর এই লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
অভিযুক্ত মোহাম্মদ মজিদ মোল্লা জেলার খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। বলেছেন, এসব অনিয়মের কোনো সত্যতা নেই।
অভিযোগের অনুলিপি মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাব বরাবর পাঠানো হলে সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১২ সালের মার্চ মাসে খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেওয়ার পর থেকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম খান আপেলসহ নিয়োগকালীন সভাপতি প্রয়াত এনায়েত হোসেন খান ঝিলুর প্রশয়ে বিদ্যালয়ের অর্থ তছরুপসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে গত ১২ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে মজিদ মোল্লা গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল সাততলা আবাসিক ভবন। এ ছাড়া জেলা শহরের আশপাশের একাদিক স্থানে জমির মালিক বনে গেছেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা বাবদে নেওয়া লাখ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের খরচ দেখিয়ে দৃষ্টিনন্দন বঙ্গবন্ধু কর্ণার ও বঙ্গবন্ধুর মিনি ভাস্কর্য বানিয়ে আলোচনায় আসেন মজিদ মোল্লা। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মুখ খুলতে থাকেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
মাস দুয়েক আগে মজিদ মোল্লার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভয়ে মজিদ মোল্লা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেননি।
শিক্ষক মজিদ মোল্লার বিরুদ্ধে ওঠা অনেক দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ,মেয়েদের সঙ্গে অনৈতিক ছবি, অকৃতকার্যদের পাস করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
লিখিত অভিযোগ এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে, মজিদ মোল্লা নিজের স্বার্থে নির্বাচন না দিয়ে পছন্দের লোক দিয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি গঠন করেন। প্রতিবছর ভর্তি নীতিমালা লঙ্ঘন করে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করেন।
মজিদ মোল্লার বিরুদ্ধে বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া বেশ কয়েকটি শ্রেণি শাখা চালু করার অভিযোগ রয়েছে। এসব শ্রেণির জন্য তাঁর পছন্দের কিছু খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ দিয়েছেন তিনি।
প্রায় পাঁচ বছর আগে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী রাজু আহমেদ, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খুশি আক্তার ও নিরাপত্তা রক্ষী রবিন মিয়ার নিয়োগ যথাযথ পক্রিয়ায় না করে গোপনীয়তার সঙ্গে করে মোটা অংকের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মজিদ মোল্লার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া অফিসের কম্পিউটার বাসায় নিয়ে যাওয়া, নির্মাণ কাজের সময় রডের খণ্ডিত অংশ ও সিমেন্টের খালি বস্তা বিক্রি করে সেই টাকা আত্মসাত, প্রতি বছর বাজেট সভা করা সহ অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে আয়–ব্যয় নিরীক্ষার বিধান থাকলেও সেটি না করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ছাপানোয় অনিয়মেরও অভিযোগ করা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. মনসুর আলীর লেখা একটি সাধারণ জ্ঞানের বই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষির্থীদের কিনতে চাপ প্রয়োগ করেছেন তিনি।
অভিযোগ আছে, ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যালয়ের ফান্ডে ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হলে সেই টাকা ব্যয় না করে নকল ভাউচারের মাধ্যমে তা লোপাট করেন এই শিক্ষক। সরকার প্রদত্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণকৃত বই বছর শেষে শিক্ষার্থীদের চাপ দিয়ে ফেরত নিয়ে সেগুলা বিক্রি করে অর্থ আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয় থেকে আয় করা অনিয়মের টাকা দিয়েই মজিদ মোল্লা মানিকগঞ্জ নগরভবন সিআরপি সংলগ্ন এলাকায় চার শতাংশ জমি কিনে সাততলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, কিনেছেন আরও জমিও।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খান বাহাদুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলেন, মজিদ মোল্লার দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিষয় নিয়ে বাধ্য হয়ে আমরা শিক্ষা অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি। এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমরা প্রকাশ্যে মানববন্ধনসহ মিছিল করব।
অভিযুক্ত মজিদ মোল্লা প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব অনিয়মের কোনো সত্যতা নেই। আমি কোনো অনিয়ম করিনি। আমার সাততলা বাড়ি এবং সম্পত্তি নিজের টাকা এবং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করতে কিছু শিক্ষক আমার পেছনে লেগেছে। তারা চাচ্ছে না বিদ্যালয়ের সুনাম অব্যাহত থাকুক।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো, আমীর হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি জানা নেই। অভিযোগের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ হাতে পেলে মন্ত্রণলয়কে অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষা অফিসের সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. মনসুর আলীর বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগের সবগুলোর বিষয় আমরা গুরুত্বসহকারে দেখব।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হবে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ঘটনার সত্যতা পেলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
| | প্রকাশক ও সম্পাদক : আব্দুল্লাহ আল মামুন, ||